• বৃহস্পতিবার, আগস্ট ১১, ২০২২
  • সর্বশেষ আপডেট : ০২:০৮ দুপুর

আমের রাজ্যে কমলার হানা!

  • প্রকাশিত ০৬:১৫ সন্ধ্যা ডিসেম্বর ১১, ২০২০
চাঁপাইনবাবগঞ্জ
লাল মাটিতে কমলা ফলিয়েছেন কৃষক মতিউর রহমান। ঢাকা ট্রিবিউন

বরেন্দ্রর রুক্ষ লাল মাটিতে কয়েকবছর আগেও এটি কৃষকদের কাছে ছিল স্বপ্নের মত। কিন্তু কমলা চাষে মতিউর রহমানের চোখ ধাঁধানো সাফল্য যেন সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে!


আমের দেশ হিসেবেই পরিচিত বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চল। তবে বরেন্দ্রর চাঁপাইনবাবগঞ্জের চাষিরা সাম্প্রতিককালে আমের পাশাপাশি পরীক্ষামূলকভাবে মাল্টা, পেয়ারা ও ড্রাগনের চাষ করে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছেন। সেই সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে মতিউর রহমান নামের এক কৃষক কমলার চাষ শুরু করেন! বরেন্দ্রর রুক্ষ লাল মাটিতে যা কয়েকবছর আগেও কৃষকদের কাছে ছিল স্বপ্নের মত। কিন্তু কমলা চাষে মতিউর রহমানের চোখ ধাঁধানো সাফল্য যেন সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে!

কম খরচে অতুলনীয় স্বাদ ও ঘ্রাণের কমলা উৎপাদন সম্ভব হওয়ায় কৃষকরা বাণিজ্যিকভাবে কমলা চাষের স্বপ্ন দেখছেন। কৃষি বিভাগ বলছে, আবহাওয়া ও মাটির গুণাগুণ অনুকূলে থাকায় এই এলাকায় কমলা চাষে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। 

মতিউর রহমানের বাগানে গিয়ে দেখা যায়, সবুজ পাতার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে অসংখ্য হলুদ ফল। তার বাগানের প্রতিটি গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে কাঁচা-পাকা কমলা। এটি নিঃসন্দেহে যে কারো দৃষ্টি কাড়বে। মাল্টার পর এবার কমলা ফলিয়ে রীতিমত বিপ্লব ঘটিয়েছেন এই কৃষক। এর আগে তার হাত ধরেই বরেন্দ্র ভূমিতে মাল্টার বিপ্লব ঘটে।

মতিউরের কমলা বাগান। ঢাকা ট্রিবিউন

মাল্টার সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে ৪ বছর আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঝিলিম ইউনিয়নের জামতাড়া এলাকায় তার ১৬ বিঘার মিশ্র ফল বাগানে ২০ প্রজাতির কমলা নিয়ে কাজ শুরু করেন বৃক্ষ রোপণে জাতীয় পুরষ্কার পাওয়া এই ফল চাষি। কিন্তু সফলতা পান যুক্তরাষ্ট্রের মেন্ডারিন, চায়না, দার্জিলিং ও অস্ট্রেলিয়া এই চার জাতের কমলায়। বর্তমানে তার বাগানে গাছের সংখ্যা ৫৫০টি। এবার প্রতিটি গাছেই ফল ধরেছে আশাতীত। গাছ রোপণের দ্বিতীয় বছরেই ফল পেলেও; কাঙ্খিত সাফল্য পান চার বছরের মাথায়।

সফল কমলাচাষি মতিউর রহমান ঢাকা ট্রিবিউনকে জানান, এবার প্রতিটি গাছে গড়ে ফলন পেয়েছেন ৩০ থেকে ৪০ কেজি। বাগান থেকে প্রতিকেজি কমলা বিক্রি করছেন ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায়। গত বছর কমলা থেকে আয় হয়েছিল ২ লাখ টাকা; এবার ৫ লাখের আশা করছেন তিনি। ইতোমধ্যে তিনি কমলার প্রায় ২০ হাজার চারা বিক্রি করেছেন। এ বছর টার্গেট ৫০ হাজার চারা তৈরির। আর আকারভেদে এসব চারার দাম ১০০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি করছেন। এ চারা দিয়ে বরেন্দ্র অঞ্চলসহ সারাদেশের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠবে মাল্টার মতই বাণিজ্যিক কমলার বাগান।

মতিউর রহমান বলেন, “আমার মত নতুন উদ্যোক্তারাও বাণিজ্যিকভাবে কমলা চাষে মাল্টার মতই লাভবান হবেন।”  

এদিকে, তার সফলতা দেখে জেলায় এখন অনেকেই শুরু করেছেন বাণিজ্যিক কমলার চাষ। আর এ ফল চাষে সরকারি সহায়তা চান বরেন্দ্র অঞ্চলের ফল বাগানিরা।  সফল ফল চাষি রফিকুল ইসলাম জানান, “আমি ৮৪০ বিঘার ফলের প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করছি। যেখানে পেয়ারা, মাল্টা, ড্রাগন, ১৮ জাতের আম, সফেদা, পার্সিমনসহ বিভিন্ন জাতের ফলের চাষ করছি। পাশাপাশি দেশি বিলুপ্ত প্রায় ফল নিয়েও আমরা গবেষণা কার্যক্রম এবং সম্প্রসারণে কাজ করছি। এবার আমার ফলের প্রজেক্টে নতুন সংযোজন করেছি কমলা চাষও। মতিউর ভাইয়ের সফলতায় আমি মুগ্ধ হয়ে তার কাছ থেকে কলম চারা সংগ্রহ করে ৭০ বিঘা জমিতে কমলার বাগান গড়ে তুলেছি। এখন আমার গাছের বয়স পাঁচমাস। আশা করছি সমানের বছর আমিও ফল পাব এবং সফল হব।”

কৃষক মতিউরের সাফল্যে বাণিজ্যিকভাবে কমলা চাষের স্বপ্ন দেখছেন অনেক কৃষক। ঢাকা ট্রিবিউন


সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (গবেষণা) কমলা রঞ্জন দাসও এই কমলা বাগান পরিদর্শন করেছেন এবং বরেন্দ্র অঞ্চলের এই ভূমিতে উদ্যোক্তা চাষি মতিউর রহমান কমলা ফলিয়ে রীতিমত বিপ্লব ঘটিয়েছেন এমন মন্তব্য করেন তিনি। শুধু তাই নয় স্থানীয় প্রশাসনও পরিদর্শন করেছেন এই কমলা বাগান এবং মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন মতিউরের কমলা চাষের সফলতায়। কমলা বাগান দেখতে আসা দর্শনার্থীর সংখ্যাও বেড়েছে। তাছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে তার কমলা বাগান দেখতে আসছেন অনেক উদ্যোক্তা ও চাষি। 

কথা হয় কমলার বাগান দেখতে আসা হাসিব হোসেন নামে এক যুবকের সাথে। তিনি বলেন, “কমলার টানে মতিউর ভাইয়ের বাগান দেখতে এসেছি। থোকায় থোকায় কমলা দেখে আমি অভিভূত। বাগান থেকে কমলা পেড়ে খেলাম। যা কখনোই ভাবিনি। এর স্বাদ ও মিষ্টতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। সবমিলিয়ে আলাদা ধরনের এক অনুভূতি। আমি মনে করি এই ধরনের উদ্যোগগুলোকে সব পর্যায় থেকে সহায়তা করা উচিত। এতে যারা উদ্যোক্তা রয়েছে তারা অনুপ্রাণিত হবে। মতিউরের এই সাফল্য সত্যিই প্রশংসনীয়। এই উদ্যোগগুলো বেঁচে থাকুক এই প্রত্যাশা করছি।”

“তবে এই ফল চাষের কিছু সমস্যাও রয়েছে। গাছে মাকড়ের আক্রমণ এবং ফল আসলে ফ্রুটফ্লাইয়ের উপদ্রব দেখা দেয়। যা দমনে বাড়তি সর্তকতার পাশাপাশি স্থায়ী সমাধানের জন্য দরকার ফল কার্যকর গবেষণা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা”, বলেন চাষি মতিউর রহমান।

বাগান পরিচর্যা করছেন মতিউর রহমান। ঢাকা ট্রিবিউন

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পোকামাকড় বড় ধরনের কোনো সমস্যা নয়। সেক্ষেত্রে এবামেকটিন গ্রুপের ইনসেক্টিসাইড সিডিউল স্প্রে করলে এটা দমন করা সম্ভব এবং ফ্রুটফ্লাইয়ের ক্ষেত্রে ফ্রুট ব্যাগিং, পাশাপাশি অন্যান্য যেসব প্রযুক্তি আছে বায়োলজিক্যাল; সেগুলো ব্যবহার করলে এবং সুন্দরভাবে ব্যবস্থাপনা করলে তেমন কোনো ক্ষতি হবে না। চাষিরা সজাগ থাকলে এবং সংশ্লিষ্ট কৃষি বিভাগ ও বিজ্ঞানীদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করলে চাষিরা ভালো প্রযুক্তি পাবে এবং উৎপাদনে কোনো ব্যাঘাত হবে না। তবে স্থায়ী সমাধানে এবং ফ্রুটফ্লাই দমনে আরও কার্যকর গবেষণার দরকার আছে বলেও মনে করেন ফল গবেষকরা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার সেন্টারের জার্মপ্লাজম অফিসার জহুরুল ইসলাম বলেন, “এ অঞ্চলের মাটি, আবহাওয়া ও জলবায়ু কমলা চাষের জন্য উপযোগী। তাই মাল্টার মতো এই ফলের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়েও আশাবাদী আমরা। এটি জেলায় ভালো হচ্ছে। কয়েক বছর ধরে আমরা মতিউর রহমানের উৎপাদিত কমলা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি। গত বছর আমাদের ল্যাবে বিদেশি আমদানিকৃত কমলা এবং এখানকার উৎপাদিত কমলা পরীক্ষা করেছি। সেখানে দেখা গেছে আমদানিকৃত কমলার চেয়ে এখানকার উৎপাদিত কমলা কোনও অংশেই কম নয়। খোসা পাতলা। সহজেই ছাড়ানো যায় এবং ভেতরের কোয়াও বেশ সুন্দর। এটি খেতে সুস্বাদু এবং মিষ্টতাও বেশ ভালো।”

প্রথমে ২০ প্রজাতির কমলা চাষ করলেও সাফল্য আসে চারটি প্রজাতিতে। ঢাকা ট্রিবিউন

এই ফল গবেষক আরও জানান, দেশে নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এই সময়ে ভালো মানের দেশি ফলের প্রাপ্যতা অনেক কম; সেদিকে দৃষ্টি দিলে চাষিরা কমলা চাষ করলে বিদেশি এই ফলের আমদানি নির্ভরশীলতা অনেকটা কমে আসবে এবং বাণিজ্যিকভাবে কমলা চাষে লাভবান হবে। তবে ভালো বাগান গড়ে তুলতে মাতৃগাছের কলম চারা রোপণের পরামর্শ এই ফল গবেষকের।

আর কৃষি বিভাগ বলছে, এ ধরনের ফল উৎপাদনে কৃষকদেরকে সহযোগিতা করে আসছে কৃষি বিভাগ। সরকারিভাবে এই ফলের বাণিজ্যিক সম্প্রসারণে গ্রহণ করা হয়েছে বিশেষ পরিকল্পনাও। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ নজরুল ইসলাম বলেন, “এখানকার কৃষকরা কমলা চাষের যে প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন, তাতে আগামী দিনে এই বরেন্দ্র ভূমিতে মাল্টার মতো কমলাতেও আমরা সফল হব। আর এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য উৎসাহী ও উদ্যোক্তা চাষিদের আমরা টেকনিক্যাল সাপোর্ট, প্রশিক্ষণ, পাশাপাশি ভালো চারা পেতে সহায়তা করছি। শুধু তাই নয়, আমরা সরকারের প্রকল্পের মাধ্যমেও কমলা চাষ সম্প্রসারণে কাজ করছি প্রতিটি উপজেলায়। আমরা আশা করছি সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মাল্টার মতো কমলা চাষ সম্প্রসারণেও সফল হব।”

50
Facebook 50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail